Header Ads

Breaking News


 প্রতিদ্বন্দ্বী

তমালিকা ঘোষাল ব্যানার্জী

"এই প্রীতমের খবর কিছু জানিস? কেমন আছে এখন?"
"খুব একটা ভালো না রে। ইন্টারনাল হেমারেজ না হলেও প্রচুর ব্লিডিং হয়েছে তো। রক্তের খুব দরকার।"
"কেন? হাসপাতালে রক্ত নেই?"
"আরে পুরোটা পায়নি। খোঁজ করে দেখতে হবে কোথায় পাওয়া যায়।"
"ওর ব্লাড গ্রুপটা কি রে? আমি ফেসবুকে পোস্ট করে দিচ্ছি। কেউ না কেউ ঠিকই হেল্প করবে।"
"ধুর, অতো সময় আছে নাকি! আজকের মধ্যেই লাগবে তো। আর ব্লাড গ্রুপ আমি জানি না। আশীষ স্যার জানতে পারেন।"
"ইস্, কি হবে বলতো! এতো খারাপ লাগে! পরীক্ষাটা আর দিতে পারবে না মনে হয়।"
"তোর কি মাথাখারাপ! বাঁচলে হয়, পরীক্ষা তো দূরের ব্যাপার।"
সামনের বেঞ্চে বসে সবটুকুই কানে যায় সাত্যকির।

সাত্যকি আর প্রীতম একই ক্লাসে পড়ে, ক্লাস টুয়েলভে। সাত্যকি বরাবরই পরীক্ষায় প্রথম হয়ে এসেছে। মাধ্যমিকের পরীক্ষাতেও স্কুল থেকে সেই প্রথম হয়েছে। উচ্চমাধ্যমিকে তাদের স্কুলে বিজ্ঞানবিভাগে নতুন ভর্তি হয় প্রীতম, শান্তশিষ্ট মুখচোরা ছেলে। তারপর থেকেই হাওয়া উল্টোদিকে বইতে থাকে। ইলেভেনে প্রথম স্থানাধিকারী হয় প্রীতম, এমনকি টুয়েলভের টেস্ট পরীক্ষাতেও সে-ই প্রথম হয়েছে। সব স্যারদের মুখে মুখে শুধুই এখন প্রীতমের নাম। মন থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না সাত্যকি। আর এমনিতেও প্রীতমের সঙ্গে সেভাবে ওর বন্ধুত্বও হয়নি কোনোদিন। এতো চুপচাপ ছেলে যে কথাই বলে না তেমন।

হঠাৎ করেই একদিন কোচিং ক্লাস থেকে ফেরার পথে প্রীতমের দুর্ঘটনা ঘটে, মাথায় চোট লাগে। সৌভাগ্যক্রমে কোনো অভ্যন্তরীণ ক্ষতি না হলেও প্রচুর রক্তপাত হয়, আর সেই কারণেই এখন রক্তের প্রয়োজন। মফস্বলের হাসপাতালে রক্তের যোগানও নেই তেমন, শহরের হাসপাতাল অনেক দূরের পথ।

পুরোনো কথা মনে পড়ে যায় সাত্যকির, জন্মদিনের কথা। ওর বন্ধুরা কেউ গিফ্ট, কেউ গ্রিটিংস কার্ড এনেছিল ওর জন্য। টিফিনের সময় সকলের সাথে আড্ডা মারতে মারতে সাত্যকি লক্ষ্য করলো একটু দূরে প্রীতম দাঁড়িয়ে আছে। আসতে চাইছে মনে হচ্ছে, কিন্তু ইতস্তত করছে। তখন সাত্যকিই এগিয়ে যায় আর প্রীতম তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর উপলক্ষ্যে এগিয়ে ধরে একখানি কাগজ, তাতে সাত্যকির স্কেচ বানানো। সকলের সামনে মনোভাব প্রকাশ না করলেও সেই স্কেচ খুবই পছন্দ হয়েছিল তার, ঘরে রেখে দিয়েছে যত্ন করে।
আজকের খবরটা শোনার পর সাত্যকি এক ফাঁকে আশীষবাবুর সঙ্গে দেখা করতে চলে যায়, প্রীতমের খোঁজখবর নেওয়ার উদ্দেশ্যে। আশীষবাবু ওদের ক্লাস টিচার, প্রতিদিনই দু'বেলা হাসপাতালে যাচ্ছেন।

টেস্টের পর এমনিতেই ক্লাস কম হয়, তাও ওদের স্কুল থেকে একটা রুটিন বানিয়ে দিয়েছে বিশেষ বিশেষ দিনে আসার জন্য। সেরকমই একটি দিনে প্রায় একমাস পর প্রীতমের উপস্থিতি ঘটে। প্রেয়ার রুমে সকল ছাত্রদের ডেকে প্রীতমকে স্কুলের তরফ থেকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে থাকে প্রীতম। আশীষবাবু তাকে জীবন সম্পর্কে অনেক উৎসাহমূলক কথাবার্তা বলতে থাকেন।

"আজ আমি আমার আরেক ছাত্রের জন্য ভীষণভাবে গর্বিত। তোমরা সকলেই তাকে চেনো, আমাদের সাত্যকি। সেদিন সে প্রীতমের খোঁজ নিতে আমার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তার ব্লাড গ্রুপ জিজ্ঞাসা করে এবং ওর সাথে মিলে যাওয়ায় রক্তও দেয়। ওর কারণেই প্রীতম আমাদের কাছে সুস্থভাবে ফিরে আসতে পেরেছে।"
সকলের বিস্মিত দৃষ্টি চলে যায় সাত্যকির উপর। বিব্রত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে সাত্যকি। আশীষবাবু বলে চলেন..
"যদিও ও আমাকে অনেক করে বারণ করেছিল জানাতে, কিন্তু আমি না বলে পারলাম না। আজ আমি সত্যিই খুব খুশি, আমার ছাত্র মানুষের মতো মানুষ হয়েছে দেখে। আশা রাখি ওকে দেখে সকলেই অনুপ্রেরণা পাবে।"

ক্লাসের এক ফাঁকে প্রীতম এসে সাত্যকির পাশে দাঁড়ায়, দু'চোখে তার কৃতজ্ঞতা।
"আমি যে কি বলে তোকে ধন্যবাদ জানাবো জানি না।"
"ওসব ধন্যবাদ তোর কাছেই রাখ, পড়াশোনায় মন দে। সামনে এইচ.এস.। আমি সমানে সমানে লড়তে পছন্দ করি, দুর্বল প্রতিদ্বন্দ্বী আমার পোষায় না। পুরোনো নোটসগুলো লাগলে জানাস।"
...সমাপ্ত...

1 টি মন্তব্য:

  1. খুব সুন্দর লেখাটা.. পড়ে ভালো লাগলো.. স্কুল জীবনের দিনগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে

    উত্তরমুছুন